মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন

ইসরায়েলে নির্বাচনে কে এগিয়ে, আইজেনকট নাকি নেতানিয়াহু

অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ের বিপরীতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তবে শেষ মুহূর্তের জনমত জরিপে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় ভোটের পরও রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা রয়েছে।

বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান হতে পারে। আবার কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় আসন না পেলে দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, পাশাপাশি লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ভোটের মাধ্যমে ১২০ আসনের নেসেটের নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন।

নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ১২ লাখ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক। সারা দেশে ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট চলবে।

জরিপে এগিয়ে আইজেনকটের দল

ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন সম্প্রচারমাধ্যমের প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থি দল ইয়াশার সামান্য ব্যবধানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

জরিপে ইয়াশার ২২ থেকে ২৩টি আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে লিকুদ পার্টি পেতে পারে ১৯ থেকে ২১টি আসন। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘বিইয়াচাদ’ বা ‘একসঙ্গে’ জোট পেতে পারে ১৪ থেকে ১৫টি আসন।

বিরোধী শিবিরের অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু পার্টি।

জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেতে পারে ১৪ থেকে ১৬টি আসন।

এই হিসাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করার অবস্থানে নেই।

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে নয়, রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেলে একটি দল পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার যোগ্য হয়। দেশটির ইতিহাসে কোনো দল এককভাবে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা সরকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আইজেনকটের

৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর জরুরি সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। তবে গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অভাব নিয়ে মতবিরোধের পর সরকার ছাড়েন তিনি।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁর ছেলে নিহত হন।

আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতা তদন্তে সরকারি কমিশন গঠন এবং অতি-কট্টর ধর্মীয় পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় বন্ধ করার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

তবে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিরাপত্তা ইস্যুতে তাঁর অবস্থান বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি। পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন আইজেনকট। তাঁর মতে, গাজায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা ও শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।

নেতানিয়াহুর সামনে যে

৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াসব চ্যালেঞ্জহু তিন দফায় ১৮ বছরেরও বেশি সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রচারের মূল বিষয় জাতীয় নিরাপত্তা। আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় নিজের অভিজ্ঞতা ও সামরিক নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।

তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা এবং পরবর্তী সংঘাতগুলো মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু। নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের বিরোধিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে, যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। এ ছাড়া গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দলগুলো। পাশাপাশি রয়েছে অতি-কট্টর ধর্মীয় দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম।

বেন-গভির ও স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে। তাঁরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে অতি-কট্টর ধর্মীয় দলগুলো ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে অব্যাহতি বজায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ইসরায়েলি বাহিনীতে জনবলসংকটের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ফিলিস্তিনি দলগুলো

এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরিপ অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট প্রায় ৯টি আসন এবং রা’আম ৫ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে।

আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে হলে এসব দলের এক বা একাধিক দলের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়া কিংবা বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দুইভাবেই সেই সমর্থন আসতে পারে।

তবে এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। আভিগদর লিবারম্যান জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে তিনি যোগ দেবেন না। বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারাও এমন সমঝোতার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে দ্বিধায় রয়েছেন।

অন্যদিকে, পরবর্তী সরকারে ফিলিস্তিনি দলগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তুলে ধরে ডানপন্থি ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু।

সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমীকরণ

নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে কয়েকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নেতানিয়াহুর জোট পর্যাপ্ত আসন পেলে অথবা অন্য আইনপ্রণেতাদের সমর্থন আদায় করতে পারলে তিনি আবারও সরকার গঠন করতে পারেন।

অন্যদিকে, আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের জন্য ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, অন্য শিবিরের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন অথবা আদর্শগতভাবে বিভক্ত বিরোধী নেতাদের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।

লিকুদ ও প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে আইজেনকট ও তাঁর কয়েকজন মিত্র নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে কাজ না করার কথা জানিয়েছেন।

কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে দীর্ঘদিন ধরে জোট গঠনের আলোচনা চলতে পারে। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আরেকটি নির্বাচনের দিকেও গড়াতে পারে।

এ ছাড়া ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের নির্বাচনী সীমার কাছাকাছি থাকা ছোট দলগুলোর ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনো দল এই সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টে আসন পাবে না। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর বুথফেরত জরিপ প্রকাশের কথা রয়েছে। এরপর প্রাথমিক সরকারি ফল আসতে শুরু করবে। তবে সামরিক বাহিনীর সদস্য, হাসপাতাল, কারাগার ও অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ভোট গণনা করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এরপরও সরকার গঠনের জন্য জোট-সংক্রান্ত আলোচনা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com